Poem

রণ-ভেরী

 কাজী নজরুল ইসলাম
[গ্রীসের বিরুদ্ধে আঙ্গোরা-তুর্ক-গভর্ণমেন্ট যে যুদ্ধ চালাইতেছিলেন, সেই যুদ্ধে কামাল পাশার সাহায্যের জন্য ভারতবর্ষ হইতে দশ হাজার স্বেচ্ছা-সৈনিক প্রেরণের প্রস্তাব শুনিয়া লিখিত। ]ওরে আয় !
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়-
ওরে আয় !
ঐ ইসলাম ডুবে যায় !
যত শয়তান
সারা ময়দান
জুড়ি’ খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয়-গান শোন্ গায়!
আজ শখ ক’রে জুতি-টক্করে
তোড়ে শহীদের খুলি দুষমন পায় পায়-
ওরে আয় !
তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়!
ধরে ঝঞ্ঝার ঝুঁটি দাপটিয়া শুধু মুসলিম-পঞ্জায়!
তোর মান যায় প্রাণ যায়-

তবে বাজাও বিষাণ, ওড়াও নিশান! বৃথা ভীরু সমঝায়!
রণ-দুর্ম্মদ রণ চায়!
ওরে আয়!
ঐ মহাসিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়!ওরে আয়!
ঐ ঝন-নন-নন রণ-ঝন-ঝন ঝঞ্ঝনা শোনা যায়!
শুনি এই ঝঞ্ঝনা-ব্যঞ্জনা নেবে গঞ্জনা কে রে হায়?
ওরে আয়!
তোর ভাই ম্লান চোখে চায়,
মরি লজ্জায়,
ওরে সব যায়,
তবু কবজায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আফসোসে হায়?
রণ দুন্দুভি শুনি’ খুন-খুবী
নাহি নাচে কি রে তোর মরদের ওরে দিলীরের গোর্দ্দায় ?
ওরে আয় !
মোরা দিলাবার খাঁড়া তলোয়ার হাতে আমাদেরি শোভা পায়
তারা খিঞ্জির যারা জিঞ্জীর-গলে ভূমি চুমি’ মুরছায়!
আরে দূর দূর! যত কুক্কুর
আসি শের-বব্বরে লাথি মারে ছি ছি ছাতি চ’ড়ে! হাতি
ঘাল হবে ফেরু-ঘায় ?
ঐ ঝননননন রণঝন ঝন ঝঞ্ঝনা শোনা যায়!
ওরে আয় !
বোলে দ্রিম্ দ্রিম্ তানা দ্রিম্ দ্রিম্ ঘন রণ-কাড়া নাকাড়ায়!
ঐ শের নর হাঁকড়ায়-
ওরে আয়!
ছোড়্ মন-দুখ,
হোক্ কন্দুক
ঐ বন্দুক তোপ, সন্দুক তোর পড়ে থাক্, স্পন্দুক বুক ঘায় !নাচ্ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ।
থৈ তান্ডব, আজ পান্ডব সম খান্ডব-দাহ চাই!
ওরে আয় !
কর্ কোরবান আজ তোর জান দিল্ আল্লার নামে ভাই!
ঐ দীন্ দীন্-রব আহব বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায়!
শেল- গর্জ্জন
করি’ তর্জ্জন
হাঁকে ‘বর্জ্জন নয় অর্জ্জন’ আজ, শির তোর চায় মা’য়!
সব গৌরব যায় যায়;
ওরে আয়!
বোলে দ্রিম্ দ্রিম্ তানা দ্রিম্ দ্রিম্ ঘণ রণ-কাড়া-নাকাড়ায়!
ওরে আয়!
ঐ কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!
ওরে আয়!
মুখ ঢাকিবি কি লজ্জায়?
হুর্ হুররে!
সেই পুর রে যথা-খুন-খোশ্ রোজ খেলে হররোজ দুষমন-খুনে ভাই!
সেই বীর-দেশে চল বীর-বেশে,
আজ মুক্ত দেশে রে মুক্তি দিতে রে বন্দীরা ঐ যায়!
ওরে আয়!
বল্ ‘জয় সত্যম্ পুরুষোত্তম্’ ভীরু যারা মা’র খায়!
নারী আমাদেরি শুনি’ রণ-ভেরী হাসে খল খল হাত-তালি দিয়ে রণে ধায় !
মোরা রণ্ চাই রণ চাই,
তবে বাজহ দামামা, বাঁধহ আমামা, হাথিয়ার পাঞ্জায়!
মোরা সত্য ন্যায়ের সৈনিক, খুন-গৈরিক বাস গা’য়
ওরে আয়!
ঐ কড় কড় বাজে রণ-বাজা, সাজ সাজ রণ-সজ্জায়!
ওরে আয়!
অব- রুদ্ধের দ্বারে যুদ্ধের হাঁক নকীব ফুকারি’ যায়!
তোপ্ দ্রুম্ দ্রুম্ গান গায় !
ওরে আয় !
ঐ ঝনন রণণ খঞ্জর-ঘাত পঞ্জরে মূরছায়!
হাঁকো হাইদার,
নাই নাই ডর,
ঐ ভাই তোর ঘুর-চর্খীর সম খুন খেয়ে ঘুর্ খায়!
ঝুটা দৈত্যেরে নাশি’ সত্যেরে
দিবি জয়-টীকা তোরা, ভয় নাই ওরে ভয় নাই হত্যায়!
ওরে আয়!
মোরা খুন্-জোশী বীর, কঞ্জুশী লেখা আমাদের খুনে নাই!
দিয়ে সত্য ও ন্যায়ে বাদশাহী, মোরা জালিমের খুন খাই!
মোরা দুর্দ্দম, ভর্ পুর্ মদ
খাই ইশকের, ঘাত শমশের ফের নিই বুক নাঙ্গায়!
লাল- পল্টন মোরা সাচ্চা,
মোরা সৈনিক, মোরা শহীদান বীর বাচ্চা,
মরি জালিমের দাঙ্গায় !
মোরা অসি বুকে বরি’ হাসি মুখে করি’ জয় স্বাধীনতা গাই!
ওরে আয়!
ঐ মহা-সিন্ধুর পার হ’তে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়!!

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্য উধাও।
জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দু’সাহসী ভ্রমনের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কোনদিন কর্মহীন পূর্ণো অবকাশে
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যাথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রানে, বিস্মৃতি প্রাদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নে মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর সেই মৃত্যুঞ্জয় –
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলাম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু বিদায়।
তোমায় হয় নি কোন ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক তাহারি আরতি
হোক তবে সন্ধ্যা বেলা-
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট্র নাহি হবে তার কোন ফুল নৈবদ্যের থালে।
তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর ত’ষায়
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে বচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু বিদায়।
মোর লাগি করিয় না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শুন্যেরে করিব পূর্ণো, এই ব্রত বহিব সদাই।
উ’কন্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সে ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপখক হতে আনি
রজনী গন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে
সে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছ নিশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করূন মুহূর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম,
ওগো নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান,
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।